ইরানে মসজিদের গম্বুজে লাল পতাকা: প্রতীক, ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট

ইরানে কোনো কোনো সময় মসজিদের গম্বুজে লাল পতাকা উত্তোলনের দৃশ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়। বিশেষ করে জামকারান মসজিদ এর গম্বুজে লাল পতাকা ওড়ানোর ঘটনা বহুবার বিশ্বজুড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই লেখায় আমি আলোচনা করব; কখন এবং কেন এই লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়, এবং এর ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক তাৎপর্য কী।

ইসলামের শিয়া ধারায় লাল রঙ ঐতিহাসিকভাবে “রক্ত” ও “শহীদির” প্রতীক। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন রা. এর শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের এক কেন্দ্রীয় ঘটনা। কারবালার এই ট্র্যাজেডি মুসলমানদের কাছে ন্যায়ের পক্ষে আত্মত্যাগের প্রতীক। যদিও শিয়াদের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত।

শিয়া ঐতিহ্যে লাল পতাকা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত।

এই পতাকা ঘোষণা করে; অন্যায়ভাবে ঝরানো রক্তের প্রতিশোধ এখনো বাকি, জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত, শোক ও প্রতিবাদের ঘোষণা।

কারবালার স্মৃতিচারণে ব্যবহৃত প্রতীকগুলোর সঙ্গে লাল পতাকার সম্পর্ক গভীরভাবে যুক্ত।

ইরানে মসজিদের গম্বুজে লাল পতাকা সাধারণত নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে উত্তোলন করা হয়:-

১. জাতীয় শোক বা বড় সামরিক ঘটনার পর: 

কোনো উচ্চপর্যায়ের সামরিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিহত হলে প্রতীকী প্রতিবাদ ও প্রতিশোধের অঙ্গীকার হিসেবে লাল পতাকা ওড়ানো হয়।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর জামকারান মসজিদের গম্বুজে লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। এটি ছিল একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তা।

২. ধর্মীয় প্রতীকী ঘোষণা হিসেবে:

শিয়া ঐতিহ্যে কখনো কখনো লাল পতাকা এমন বার্তা দেয় যে “শহীদের রক্তের প্রতিশোধ এখনো নেওয়া হয়নি।” এটি ঐতিহাসিক স্মৃতির ধারাবাহিকতা বহন করে।

প্রশ্ন হতে পারে কেন জামকারান মসজিদেই লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়? ইতিহাস বলে জামকারান মসজিদ শিয়া  মুসলমানদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি স্থান। বিশ্বাস করা হয়, এটি দ্বাদশ ইমাম মাহদির সঙ্গে আধ্যাত্মিকভাবে সম্পৃক্ত। ফলে এখান থেকে কোনো প্রতীকী বার্তা দেওয়া হলে তা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

লাল পতাকার রাজনৈতিক তাৎপর্য অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা শিয়া ধর্মীয় ভাবধারার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। তাই ধর্মীয় প্রতীক প্রায়ই রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। লাল পতাকা উত্তোলন মূলত : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে সতর্কবার্তা, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রতীক, শহীদদের স্মরণ ও প্রতিশোধের শপথ। এটি সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা নয়, বরং সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় ভাষায় প্রতিবাদের প্রগাঢ় প্রকাশ।

পরিশেষে বলা যায়, ইরানে মসজিদের গম্বুজে লাল পতাকা উত্তোলন একটি গভীর প্রতীকী কাজ। এটি শুধুমাত্র একটি রঙিন পতাকা নয়; বরং ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, শোক, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বার্তার সমন্বয়। কারবালার স্মৃতি থেকে শুরু করে আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যন্ত, লাল পতাকা শিয়া চেতনার এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন 

সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Share