গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সেই মত প্রকাশের সর্বোচ্চ রূপ হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। একটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতা পরিমাপ করা যায় নির্বাচনকালে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ, বক্তব্য ও পারস্পরিক সহনশীলতার মাধ্যমে। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে যখন রাজনৈতিক অঙ্গন আবারও সরব হয়ে উঠছে, তখন গণভোটের প্রচারণায় অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক শক্তির বিশেষত বিএনপি ও জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের—দায়িত্বশীল, সহনশীল ও শিষ্টাচারপূর্ণ বক্তব্য জাতির কাছে বিশেষভাবে প্রত্যাশিত।
নির্বাচন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি মতের প্রতিযোগিতা, আদর্শের লড়াই এবং জনগণের আস্থার পরীক্ষাক্ষেত্র। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বহু সময় দেখা যায়, ভিন্নমতকে সম্মান না জানিয়ে আক্রমণাত্মক ভাষা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও উসকানিমূলক মন্তব্য প্রচারণার অংশ হয়ে ওঠে। এর ফলে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়, সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ে এবং সাধারণ জনগণ আতঙ্কিত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই প্রবণতা কোনোভাবেই সহায়ক নয়।
বিএনপি ও জামায়াত জোট দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক কাঠামো ও সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। ফলে তাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও আচরণ সমাজে সরাসরি প্রভাব ফেলে। গণভোটের প্রচারণায় যদি তারা সংযত ভাষা ব্যবহার করেন, যুক্তিনির্ভর সমালোচনায় মনোযোগ দেন এবং প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক শত্রু নয় বরং ভিন্নমতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেন, তবে তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সহনশীল বক্তব্য মানে এই নয় যে নিজের অবস্থান দুর্বল করা বা দাবি থেকে সরে আসা। বরং শান্ত, শালীন ও তথ্যভিত্তিক ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন করাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়। শিষ্টাচারপূর্ণ প্রচারণা জনগণের কাছে নেতৃবৃন্দের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়, আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু ভোটগ্রহণের দিনে নয়, তার পূর্ববর্তী পুরো প্রচারণা পর্বের ওপর নির্ভর করে।
আজকের বাংলাদেশে তরুণ সমাজ রাজনীতি সচেতন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং বক্তব্য-বিবৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। নেতিবাচক ও উসকানিমূলক বক্তব্য তরুণদের রাজনীতি বিমুখ করতে পারে, আবার সহনশীল ও ইতিবাচক রাজনৈতিক চর্চা তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আগ্রহী করে তুলতে পারে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে বিএনপি ও জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উচিত হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
পরিশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে গণভোটের প্রচারণায় বিএনপি ও জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সহনশীল, শিষ্টাচারপূর্ণ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য জাতির প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা পূরণ হলে গণতন্ত্র হবে শক্তিশালী, রাজনীতি হবে মানবিক এবং জনগণ পাবে তাদের কাঙ্ক্ষিত শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ।
✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইনসাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী