আল মাহমুদ: ‘সোনালী কাবিন’-এর কবি

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতায় যাঁরা স্বকীয় কণ্ঠে নতুন স্বর যুক্ত করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আল মাহমুদ। গ্রামীণ জীবন, লোকঐতিহ্য, প্রেম, ধর্মীয় অনুষঙ্গ এবং ইতিহাস-সচেতনতা—সব মিলিয়ে তাঁর কবিতার ভুবন এক অনন্য নান্দনিকতা নির্মাণ করেছে। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ সোনালী কাবিন তাঁকে বাংলা কবিতায় স্থায়ী আসন দিয়েছে। তাঁর মৃত্যুদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কবির শারীরিক অবসান ঘটলেও তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তা অমর।

১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন আল মাহমুদ। শৈশব থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল। ষাটের দশকে তিনি বাংলা কবিতায় শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সাংবাদিকতা, সম্পাদনা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি উপন্যাস ও ছোটগল্পও রচনা করেছেন। তবে কবি হিসেবেই তিনি সর্বাধিক সমাদৃত।

১৯৭৩ সালে প্রকাশিত সোনালী কাবিন কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক দলিল। এ গ্রন্থে প্রেম ব্যক্তিগত আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য লাভ করেছে। গ্রামীণ বাংলার ভাষা, উপমা ও চিত্রকল্প ব্যবহার করে কবি যে আধুনিক কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন, তা বাংলা কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

‘কাবিন’ শব্দটি বিবাহবন্ধনের প্রতীক; কিন্তু আল মাহমুদের কাব্যে তা রূপ নিয়েছে জাতিসত্তা, ইতিহাস ও প্রেমের সম্মিলিত অঙ্গীকারে। ফলে তাঁর কবিতা একই সঙ্গে ব্যক্তিমানস ও সামষ্টিক চেতনার কাব্য হয়ে উঠেছে।

২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুদিনে সাহিত্যপ্রেমীরা গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করেন। নানা সাহিত্যসভা, আলোচনা ও পাঠচক্রে তাঁর কবিতা আবৃত্তি করা হয়। এই দিনটি কেবল শোকের নয়; বরং তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার পুনরাবিষ্কারের দিন।

আল মাহমুদের জীবন ও সাহিত্য আমাদের শিখিয়েছে নিজস্ব শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ রেখে আধুনিকতার পথে হাঁটাই প্রকৃত সৃজনশীলতার পরিচয়। তাঁর কবিতায় যেমন প্রেম আছে, তেমনি প্রতিবাদ; যেমন ইতিহাস আছে, তেমনি মানবিকতার গভীর স্পর্শ।

মৃত্যু মানুষকে দেহগতভাবে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু শিল্পীকে মুছে দিতে পারে না। আল মাহমুদ তাঁর কবিতার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। ‘সোনালী কাবিন’-এর কবির মৃত্যুদিন তাই আমাদের কাছে আত্মসমালোচনারও দিন; আমরা কতটা তাঁর সাহিত্যকে ধারণ করতে পেরেছি?

তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়, আল মাহমুদ বাংলা কবিতার আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে চিরকাল জ্বলজ্বল করবেন।

✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Share