সেনা পরিচয়ে সাংবাদিক তুলে নেওয়া:গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত

অনলাইন সংবাদ মাধ্যম বাংলাদেশ টাইমসের সাংবাদিকদের সেনা পরিচয়ে তুলে নেওয়ার ঘটনা দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা তুচ্ছ ঘটনা নয়; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এক ধরনের সরাসরি ও পরিকল্পিত আঘাত বলেই প্রতীয়মান হয়।

গতকাল ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার রাতে ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকায় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলাদেশ টাইমসের অফিসে প্রবেশের পর সেনাবাহিনীর সদস্যরা ২১ জন সাংবাদিক এবং কর্মীকে তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও তুলে নিয়ে যাওয়ার ২ ঘন্টার মধ্যে আটককৃত সাংবাদিকদের ছেরে দেয়া হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

ধরে নিয়ে ছেরে দেওয়ার পরও আমি মনে করি; একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা প্রশ্নাতীতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করেন এবং জনগণের জানার অধিকার রক্ষা করেন। সেই সাংবাদিকদের আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তুলে নেওয়া সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং মানবাধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সেনা পরিচয়ের ব্যবহার। যদি প্রকৃত অর্থেই রাষ্ট্রের কোনো নিরাপত্তা বাহিনী এতে জড়িত থাকে, তবে তা বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও সাংবিধানিক সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে, যদি ভুয়া পরিচয়ে এই কাজ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও কম ভয়াবহ নয়। উভয় ক্ষেত্রেই এটি আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং জনমনে ভীতি ও অনাস্থা সৃষ্টি করে।

এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে গণমাধ্যম আজো ঝুঁকিমুক্ত নয়। ভয়ভিত্তিক পরিবেশে সত্য প্রকাশ অসম্ভব হয়ে পড়ে। আজ যদি সাংবাদিকদের তুলে নেওয়া যায়, আগামীকাল যেকোনো ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকই একই পরিণতির শিকার হতে পারেন। এ কারণেই বিষয়টি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য হুমকি।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়, নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করাও। আমরা মনে করি, এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এখন সময়ের দাবি। দোষীদের পরিচয় প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

গণতন্ত্রের শক্তি আসে ভয় থেকে নয়, আসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন থেকে। সেনা পরিচয়ে সাংবাদিক তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা যদি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। এই অশনিসংকেত উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Share