ইতিহাসের কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো জাতির বিবেককে নাড়া দেয়, প্রশ্ন করতে শেখায়। ২৮ জানুয়ারি ২০১০ তেমনই একটি দিন। যে দিনটি ফ্যাসিবাদের আইকনিক চরিত্র শেখ মুজিবুর রহমানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আগস্ট বিপ্লবীদের তথাকথিত ফাঁসির নামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের নির্মম স্মৃতি বহন করে। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে ক্ষমতা রক্ষার রাজনীতিতে আদর্শবাদী বিপ্লবীদের জীবনকে বলি দেওয়া হয়েছিল।
আগস্ট বিপ্লবীরা ছিলেন শোষণ, অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ। তাঁদের সংগ্রাম ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কিন্তু ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কাছে বিপ্লবীরা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় হুমকি। ফলে তাঁদের দমন করতে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করা হয়, আর “বিচার” নামক শব্দটি পরিণত হয় হত্যাকে বৈধ করার হাতিয়ারে।
২৮ জানুয়ারিতে সংঘটিত ফাঁসিগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায়বিচারের ন্যূনতম মান, সবকিছুই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এই ফাঁসিগুলো আইনগত শাস্তির চেয়ে বেশি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবী চেতনার মূলোৎপাটন।
এই দিনটি আমাদের সামনে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভয়াবহ রূপ তুলে ধরে। যখন রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, বরং ক্ষমতার স্বার্থে হত্যাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার অর্থহীন হয়ে পড়ে। আগস্ট বিপ্লবীদের রক্ত সেই ব্যর্থতারই সাক্ষ্য বহন করে।
২৮ জানুয়ারি তাই শুধু শোকের দিন নয়, এটি প্রতিবাদের দিনও। এই দিন আমাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়; ইতিহাসের এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে না নেওয়া, বরং সত্যকে তুলে ধরা। বিপ্লবীদের আদর্শ ছিল মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার পক্ষে; তাঁদের হত্যা সেই আদর্শকে দমাতে পারেনি, বরং আরও শক্তিশালী করেছে।
অতএব, ২৮ জানুয়ারিকে “আগস্ট বিপ্লবীদের ফাঁসির নামে হত্যা দিবস” হিসেবে স্মরণ করা মানে অতীতের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা এবং ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক থাকা। এই স্মরণ আমাদের শেখায়; ন্যায়বিচার ছাড়া রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না, আর বিপ্লবীদের রক্ত কখনোই বৃথা যায় না।
✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইনসাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী