২০২৪ এর ৫ আগষ্টের পর ফ্যাসিবাদী আওয়ামীলীগ আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশ: মানবিকতার পরীক্ষায় কি উত্তীর্ণ?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী দিন। দীর্ঘদিন ধরে চলমান কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা স্তরে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী; পুলিশ নিয়ে জনগণের আশা ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ শাসনামলে নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা কি আদৌ মানবিক ও গণমুখী ভূমিকায় ফিরে আসতে পেরেছেন?

আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে পুলিশ বাহিনী ক্রমে একটি দলনির্ভর ও দমনমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, এমন অভিযোগ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহুবার তুলেছে। বিরোধী মত দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, রাজনৈতিক মামলায় নিরপেক্ষতার অভাব, গুম-খুন ও বেআইনি আটকের ঘটনায় পুলিশের একটি অংশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই সময় যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের বড় অংশই এমন একটি সংস্কৃতির ভেতর প্রশিক্ষিত হয়েছেন, যেখানে মানবাধিকার নয়; বরং ‘উপরের নির্দেশ’ই ছিল মুখ্য।

ক্ষমতার পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল, পুলিশ বাহিনী অন্তত আচরণগতভাবে নতুন পথ নেবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হতাশাজনক। দেশের বিভিন্ন এলাকায় থানায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, প্রভাবশালী মহলের প্রতি পক্ষপাত, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মামলা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান—এসব পুরোনো চর্চা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে, এমন দাবি করা কঠিন।

এর মূল কারণ একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব, অন্যদিকে অতীত অপরাধের জবাবদিহির অনুপস্থিতি। ফ্যাসিবাদী সময়কালে মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও বিচার না হলে বাহিনীর ভেতরে পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছায় না। শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি মানবিক আচরণের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

তবে এটাও স্বীকার করতে হবে, পুলিশ বাহিনীর সবাই একরকম নন। অনেক পুলিশ সদস্য আছেন, যারা রাজনৈতিক চাপ ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানবিক থাকার চেষ্টা করেছেন, নাগরিকের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু বিচ্ছিন্ন এই ইতিবাচক উদাহরণগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলে সামগ্রিক চিত্র বদলায় না।

মানবিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ ও পদায়ন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন, মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং অতীত অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার অপরিহার্য। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

২০২৪-এর ৫ আগস্টের পরও যদি পুলিশ বাহিনী জনগণের আস্থার জায়গায় ফিরতে না পারে, তবে তা হবে একটি বড় ব্যর্থতা। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ শাসকের নয়, জনগণের সেবক—এই সত্য প্রতিষ্ঠা না হলে ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা রূপ বদলে থেকেই যাবে।

✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Share