বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে হত্যা ও সহিংসতা এক দুঃখজনক ও পুনরাবৃত্ত বাস্তবতা। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, পরবর্তী সামরিক শাসন, এমনকি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সময়েও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বারবার জাতিকে রক্তাক্ত করেছে। রাজনীতিকে মতাদর্শের লড়াই থেকে সরিয়ে যখন প্রতিহিংসা, দমন ও হত্যার অস্ত্রে পরিণত করা হয়, তখন গণতন্ত্র তার মৌলিক ভিত্তি হারাতে বাধ্য হয়।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পরিবর্তন। কিন্তু হত্যার রাজনীতি এই তিনটি স্তম্ভকেই ভেঙে দেয়। ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে রাজনীতি হয়ে ওঠে ভয়ের খেলায় পরিণত, যেখানে সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শুধু ব্যক্তি হত্যায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেও পুষ্ট করে। বহু আলোচিত হত্যার সঠিক বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা বারবার উৎসাহিত হয়। বিচারহীনতা যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং গণতন্ত্র কেবল নামমাত্র কাঠামোতে পরিণত হয়। একটি রাষ্ট্রে যদি নাগরিকরা বিশ্বাসই না করে যে ন্যায়বিচার পাবে, তবে সেখানে গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না।
হত্যার রাজনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে তরুণ সমাজকে। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ মানেই যদি জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়, তবে মেধাবী ও সচেতন তরুণরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এতে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হবে এবং রাজনীতি দখল করবে সহিংস ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে গণতন্ত্রহীনতার দিকে ঠেলে দেয়।
এছাড়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও হত্যার রাজনীতি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে। একটি রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য পরিচিত হয়, তখন বিদেশি বিনিয়োগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পায়। গণতন্ত্র শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। মতপার্থক্য থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন কখনো হত্যার পথ বেছে না নেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে, যাতে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে না পারে।
পরিশেষে বলা যায়, চব্বিশের জুলাই পরবর্তী এদেশের মানুষ একটি বাংলাদেশ পন্থী নিরাপত্তামূলক নাগরিক বান্ধব রাষ্ট্র গঠনে শপথবদ্ধ হয়েছিল।অথচ আজ আমরা সেই শপথ থেকে দুরে বহু দূরে অবস্থান করছি। সেজন্য পর্যবেক্ষক মহলের আশংকা হত্যার রাজনীতি বন্ধ না হলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে নির্বাচন থাকবে কিন্তু পছন্দের স্বাধীনতা থাকবে না, প্রতিষ্ঠান থাকবে কিন্তু আস্থা থাকবে না। গণতন্ত্র বাঁচাতে হলে রাজনীতিকে হত্যা ও সহিংসতার কলঙ্ক থেকে মুক্ত করাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইনসাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী