শুধুমাত্র জুলাইয়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার “অপরাধে” দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের চারজন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করার ঘটনা আমাদের গণতান্ত্রিক চেতনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তির ওপর এক গভীর আঘাত। এই সিদ্ধান্ত শুধু চারজন ব্যক্তির চাকরি হারানোর ঘটনা নয়; এটি আমাদের গণমাধ্যম কাঠামোর ভেতরে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রবণতার এক উদ্বেগজনক বহিঃপ্রকাশ।
গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের “চতুর্থ স্তম্ভ”। এই স্তম্ভের মূল শক্তি হলো স্বাধীনতা—সত্য বলার স্বাধীনতা, প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা এবং জনস্বার্থে অবস্থান নেওয়ার স্বাধীনতা। কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুতে; তা জুলাইয়ের আন্দোলন হোক বা অন্য কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশ্ন; ব্যক্তিগত বা পেশাগত অবস্থান নেওয়া সাংবাদিকতার পরিসরের মধ্যেই পড়ে, যতক্ষণ তা তথ্যভিত্তিক, নৈতিক এবং পেশাগত মানদণ্ডসম্মত। সেই অবস্থানকে “অপরাধ” আখ্যা দিয়ে চাকরিচ্যুত করা মানে ভিন্নমতকে শাস্তি দেওয়া।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: সাংবাদিক কি কেবল ক্ষমতার ভাষ্য পুনরাবৃত্তি করার যন্ত্র? নাকি তিনি সমাজের বিবেক? যদি সাংবাদিকরা জনস্বার্থে, মানবিকতা বা ন্যায়ের প্রশ্নে অবস্থান নিতে না পারেন, তবে সংবাদমাধ্যম কেবল প্রচারযন্ত্রে পরিণত হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণের তথ্য জানার অধিকার।
চাকরিচ্যুত চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যদি কোনো পেশাগত অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তবে তা স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু যদি তাদের একমাত্র “অপরাধ” হয় একটি নির্দিষ্ট সময় বা আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, তবে সেটি স্পষ্টতই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত দমন নয়, বরং বিতর্ক ও সংলাপের মাধ্যমেই সমাধান খোঁজা হয়।
এই ঘটনার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ বা “সেলফ-সেন্সরশিপ”-এর সংস্কৃতি তৈরি হওয়া। যখন সাংবাদিকরা দেখবেন যে একটি মত প্রকাশের কারণে চাকরি চলে যেতে পারে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি এড়িয়ে চলবেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো চাপা পড়ে যাবে, সত্যের অনুসন্ধান থেমে যাবে, এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ন হবে।
আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি—১. চাকরিচ্যুতির কারণ প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা হোক।২. স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হোক।৩. সাংবাদিকদের মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত করা হোক।
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করে সাময়িক নীরবতা আনা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজকে দুর্বল করে। জুলাইয়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া যদি অপরাধ হয়, তবে আগামীকাল অন্য কোনো ইস্যুতে সত্য বলাও অপরাধ হয়ে উঠবে।
আমি আমার লেখায় স্পষ্টভাবে জানাতে চাই—ভিন্নমত দমন নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই হোক আমাদের পথ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে কেবল সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা করা নয়; এটি পুরো জাতির জানার অধিকার রক্ষার সংগ্রাম।
✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইনসাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী