প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী অধিকার, সমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের স্মারক হিসেবে এই দিনটি আজ বিশ্বজুড়ে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানাতেই এই দিবসের সূচনা। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নে আন্তর্জাতিক নারী দিবস কতটুকু সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারছে?
আন্তর্জাতিক নারী দিবস মূলত নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শ্রমক্ষেত্রে নারীদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ভোটাধিকারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তারই ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রচলন ঘটে। পরবর্তীতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই দিবসকে বিশ্বব্যাপী পালনের আহ্বান জানায়। ফলে এটি আজ একটি বৈশ্বিক সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নারীর ক্ষমতায়নে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। এই দিনকে কেন্দ্র করে সমাজে নারীর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। বিভিন্ন সেমিনার, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে নারী সম্পর্কিত নানা সমস্যা ও সম্ভাবনা সামনে আসে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নারীর মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়।
এই দিবস নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক দেশেই নারী দিবস উপলক্ষে সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নারীবান্ধব নীতি, কর্মসূচি বা উদ্যোগ ঘোষণা করে থাকে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ বাড়ানোর নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ফলে এটি নারীর ক্ষমতায়নের পথে একটি অনুপ্রেরণামূলক ভূমিকা পালন করে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস নারীদের অর্জন ও সাফল্যকে সামনে নিয়ে আসে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল নারীদের অবদান তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য, প্রশাসন, রাজনীতি কিংবা ব্যবসা—প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের সাফল্যের গল্প নতুন প্রজন্মের মেয়েদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। এতে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্ন দেখার সাহস তৈরি হয়।
তবে বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, শুধুমাত্র একটি দিবস পালন করলেই নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না। অনেক সময় নারী দিবস উদযাপন কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা প্রতীকী কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকে। বিশ্বের অনেক দেশেই এখনো নারীরা বৈষম্য, সহিংসতা, বেতন বৈষম্য এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে। তাই দিবসটির মূল লক্ষ্য তখনই সফল হবে, যখন এটি বাস্তব পরিবর্তনের পথে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নেবে।
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক উদ্যোগ। নারীর শিক্ষা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি করা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার থেকেই ছেলে ও মেয়ের সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক নারী দিবস নারীর ক্ষমতায়নের সংগ্রামে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা ও স্মারক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদার অধিকারী এবং সমাজের উন্নয়নে উভয়েরই সমান ভূমিকা রয়েছে। তাই নারী দিবসকে কেবল উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, এটিকে বাস্তব পরিবর্তনের অঙ্গীকারে পরিণত করাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী