একটি আদর্শবাদীছাত্র সংগঠনের ঐতিহাসিক যাত্রা

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির এই দিনটি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এদিন আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আনুষ্ঠানিকভাবে তার যাত্রা শুরু করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিকতা, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি সচেতন ছাত্রসমাজ গড়ে তোলা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ছিল সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেশের ছাত্ররাজনীতি নানা বিভাজন, সহিংসতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক চিন্তাধারায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হতে থাকে এবং ছাত্রসমাজ ধীরে ধীরে আদর্শচ্যুতির পথে অগ্রসর হয়। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৭ সালের এই দিনে আত্মপ্রকাশ করে একটি ছাত্র সংগঠন, যারা রাজনীতিকে ক্ষমতার হাতিয়ার নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের একটি নৈতিক মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।

এই সংগঠনের মূল দর্শন ছিল—জ্ঞান, চরিত্র ও নেতৃত্বের সমন্বয়ে আদর্শ মানুষ তৈরি করা। তারা বিশ্বাস করত, একটি সুন্দর সমাজ গড়তে হলে আগে প্রয়োজন সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক। তাই শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিকতার চর্চাকে তারা তাদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে স্থান দেয়। ক্যাম্পাসভিত্তিক শিক্ষামূলক কার্যক্রম, মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংগঠনটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশ, ভুল ব্যাখ্যা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তারা তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা ছাত্রসমাজে একটি ভিন্নধর্মী, শালীন ও আদর্শভিত্তিক ধারার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত হতে থাকে এবং অনেক শিক্ষার্থী এই সংগঠনের মাধ্যমে আদর্শিক চিন্তায় অনুপ্রাণিত হয়।

১৯৭৭ সালের এই দিনে শুরু হওয়া যাত্রা আজ শুধুই একটি সংগঠনের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে একটি আদর্শিক ধারার প্রতীক। এই সংগঠন প্রমাণ করেছে যে ছাত্ররাজনীতি সহিংসতা ও স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠে নৈতিকতা, মানবিকতা ও গঠনমূলক চিন্তার মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭৭ সালের এই দিনে যাত্রা শুরু করা আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আজও তার মূল দর্শনকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আদর্শবান ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন নিয়ে তাদের পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক।

✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Share