রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য দান করেছেন এক অতুলনীয় বরকতময় রাত; লাইলাতুল কদর। এই রাতের মর্যাদা এতটাই মহান যে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, এটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ, এই এক রাতের ইবাদতের সওয়াব প্রায় তিরাশি বছরের ইবাদতের সমান বা তার চেয়েও বেশি। তাই মুসলিম উম্মাহর কাছে লাইলাতুল কদর শুধু একটি রাত নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা প্রার্থনা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ সুযোগ।
লাইলাতুল কদরের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের একটি পূর্ণ সূরা নাজিল হয়েছে; সূরা আল-কদর। সেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন যে এই রাতেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এই রাতে অসংখ্য ফেরেশতা ও রূহ (হজরত জিবরাইল আ.) আল্লাহর নির্দেশে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং ফজরের সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত শান্তি ও কল্যাণে ভরে থাকে সমগ্র পরিবেশ।
এই রাতের নাম “কদর” হওয়ার পেছনেও গভীর অর্থ রয়েছে। “কদর” শব্দের অর্থ মর্যাদা, সম্মান এবং ভাগ্য নির্ধারণ। অনেক ইসলামী আলেমের মতে, এই রাতে মানুষের আগামী বছরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আল্লাহর নির্দেশে নির্ধারিত হয়। ফলে এই রাত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের এক সম্ভাবনাময় মুহূর্ত হিসেবেও বিবেচিত।
হাদিস অনুযায়ী লাইলাতুল কদর রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো। এর পেছনে একটি শিক্ষা রয়েছে, মুমিন যেন পুরো শেষ দশক জুড়েই বেশি বেশি ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও এই দশকে বিশেষভাবে ইবাদতে মনোযোগী হয়ে উঠতেন। তিনি রাত জেগে নামাজ আদায় করতেন, ইতিকাফ করতেন এবং পরিবার-পরিজনকেও ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন। এটি আমাদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
লাইলাতুল কদরের রাতে মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন ইবাদত ও আমল করার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—নফল নামাজ আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহর জিকির করা, তওবা ও ইস্তিগফার করা, বেশি বেশি দোয়া করা
একটি বিশেষ দোয়া এই রাতে পড়ার জন্য হাদিসে সুপারিশ করা হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যদি আমি লাইলাতুল কদর পাই তাহলে কী দোয়া করব? তখন তিনি বলেন—
“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।” অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।
লাইলাতুল কদর আমাদেরকে শুধু ইবাদতের গুরুত্বই শেখায় না; এটি মানুষের জীবনে আত্মসমালোচনা ও পরিবর্তনেরও একটি সুযোগ এনে দেয়। এই রাতে মানুষ তার অতীত ভুলত্রুটি ও গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার অঙ্গীকার করতে পারে।
বর্তমান যুগে মানুষ পার্থিব ভোগ-বিলাস ও ব্যস্ততার মাঝে প্রায়ই আধ্যাত্মিকতা ভুলে যায়। লাইলাতুল কদর সেই ভুলে যাওয়া আধ্যাত্মিক চেতনাকে আবার জাগিয়ে তোলে। এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের প্রকৃত সফলতা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই নিহিত।
লাইলাতুল কদর আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক অসীম রহমতের রাত। যে ব্যক্তি আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সঙ্গে এই রাতের ইবাদত করে, আল্লাহ তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন এবং তার জীবনে কল্যাণের দ্বার খুলে দেন। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এই মহিমান্বিত রাতের মর্যাদা উপলব্ধি করা এবং রমজানের শেষ দশকে বেশি বেশি ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভের চেষ্টা করা।
এই বরকতময় রাত আমাদের জীবনে নতুন আলো, নতুন আশা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ খুলে দিক; এই হোক আমাদের প্রার্থনা।
✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী