বাংলাদেশের রাজনীতি বহু উত্থান–পতনের সাক্ষী। প্রতিটি নির্বাচনের পর জনগণ নতুন আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে বিজয়ী দলের দিকে। তারা কি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক চক্রেই আবদ্ধ থাকবে? চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক চরম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে বিএনপি বিজয়ী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, ক্ষমতার উচ্ছ্বাসে আত্মভোলা না হয়ে বিনয়ী থাকা এবং একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
বিজয় মানুষের মাঝে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দ ও আত্মতৃপ্তি এনে দেয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিজয় মানে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করা নয়; বরং সমগ্র জাতির আস্থা অর্জন করা। যে জনগণ ভোট দিয়ে একটি দলকে নির্বাচিত করে, তারা শুধু সমর্থকরাই নয়; ভিন্নমতাবলম্বীরাও সেই রাষ্ট্রের নাগরিক। তাই বিজয়ী বিএনপির উচিত হবে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়া। বিরোধী দলকে শত্রু মনে না করে গণতন্ত্রের অংশীদার হিসেবে সম্মান জানানোই হবে প্রকৃত রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়।
বিনয় রাজনীতির দুর্বলতা নয়; বরং শক্তির বহিঃপ্রকাশ। একটি দল যখন বিনয়ের সঙ্গে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন প্রশাসন ও জনগণের মাঝে আস্থা তৈরি হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয়করণ ও দুর্নীতির সংস্কৃতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে জনগণের প্রত্যাশা ভঙ্গ হবে। তাই নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রথম শর্ত হতে পারে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ।
একটি দায়িত্বশীল সরকারকে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণ সমাজ আজ কর্মসংস্থানের সংকট, দক্ষতার ঘাটতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়নমূলক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করতে হবে। একইসঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পকে সহায়তা দেওয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
নতুন বাংলাদেশ গড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না। বিএনপি যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তাদের উচিত হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কৌশলী ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বিজয় কোনো দলের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং একটি নতুন দায়িত্বের সূচনা। বিএনপি যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়, তবে তাদের ক্ষমতার অহংকার পরিহার করে বিনয়ী হতে হবে এবং বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে এসে ঐক্যের রাজনীতি গড়ে তুলতে হবে। দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, সুশাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি নতুন, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।আমরা আশা রাখতে চাই, তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার মধ্যদিয়ে পৃথিবীর সামনে নজির স্থাপন করবে।
✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইনসাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী