বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী বহু বছর ধরে নিজেদেরকে আদর্শ, নৈতিকতা এবং ত্যাগের রাজনীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই দাবিকে ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মাঠের রাজনীতি, নেতৃত্বের আচরণ এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সব মিলিয়ে আজ জামায়াতের রাজনৈতিক চরিত্র তীব্র বৈপরীত্যে ভরপুর। কথায় আদর্শ, বাস্তবে সুযোগসন্ধানী রাজনীতি। এই দ্বৈত চিত্র এখন অনেকের কাছেই স্পষ্ট।বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত কার্যত বিরোধী শক্তি হলেও তাদের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীন বলে মনে হয় না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তারা বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমঝোতা ও লিয়াজোর মধ্য দিয়েই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে বিরোধী রাজনীতির ভাষণ, অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এই দ্বিমুখী অবস্থান দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চরিত্রকে প্রায় মুছে দিয়েছে।রমজান মাসে এই বৈপরীত্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে। রাজধানীতে দেখা যায় জামায়াতের নেতারা বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক জিয়ার সঙ্গে ইফতার করছেন, হাসিমুখে ছবি তুলছেন এবং রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের প্রদর্শন করছেন। কিন্তু একই সময়ে দেশের মফস্বল অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যায়। বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে, মারামারি হচ্ছে, এবং সেই সংঘর্ষের মধ্যে কর্মীরা প্রাণ হারাচ্ছে।এই দৃশ্য সাধারণ মানুষের কাছে এক নির্মম প্রশ্ন তুলে দেয়। উপরে নেতাদের সৌহার্দ্য আর নিচে কর্মীদের রক্তপাত। নেতাদের ইফতার টেবিলে হাসি, আর মাঠে কর্মীদের লাশ। এই বৈপরীত্য রাজনীতির নৈতিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছু নয়।জামায়াতের ভেতরেও এখন আর ঐক্যের গল্প খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য শোনায় না। প্রকাশ্যে শৃঙ্খলা ও ঐক্যের কথা বলা হলেও বাস্তবে ভেতরে ভেতরে চলছে নীরব কোন্দল, প্রভাবের লড়াই এবং অবস্থান দখলের প্রতিযোগিতা। অনেক ত্যাগী কর্মী অভিযোগ করেন সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো এখন আর সংগ্রাম বা ত্যাগের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। বরং নেতৃত্বের কাছে ঘনিষ্ঠতা, আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত প্রভাবই হয়ে উঠেছে মূল যোগ্যতা।আরেকটি বিষয় এখন সামাজিক আলোচনায় প্রায় ব্যঙ্গের পর্যায়ে চলে গেছে। জামায়াতের অনেক নেতা নিজেদের পরিচয়ে “অধ্যাপক” বা “প্রভাষক” শব্দ ব্যবহার করেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তাদের অনেকেই কোনো কিন্ডারগার্টেন বা ছোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এই ধরনের অতিরঞ্জিত পরিচয় এখন সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যরসের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ খোলাখুলি বলছে, যেখানে পরিচয়ই এতটা ফুলিয়ে বলা হয়, সেখানে রাজনীতির সততা কোথায়।ফলস্বরূপ এক সময় যে দল নিজেদেরকে কঠোর আদর্শের দল হিসেবে তুলে ধরত, সেই দল এখন অনেকের চোখে রাজনৈতিক ভণ্ডামির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একদিকে আদর্শের বুলি, অন্যদিকে ক্ষমতার হিসাব। একদিকে নেতাদের ইফতার ও সৌজন্য রাজনীতি, অন্যদিকে মাঠে কর্মীদের সংঘর্ষ ও লাশ। সামাজিক পরিচয়ের অতিরঞ্জন আবার অনেক সময় রাজনীতিকে উপহাসের বিষয়েও পরিণত করছে।সব মিলিয়ে জামায়াতের বর্তমান বাস্তবতা অনেক কঠিন প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। যদি একটি দল সত্যিই আদর্শ, সততা এবং ত্যাগের রাজনীতি করার দাবি করে, তাহলে তাদের নেতৃত্বের আচরণ, সংগঠনের সংস্কৃতি এবং মাঠের বাস্তবতার মধ্যে অন্তত কিছু সামঞ্জস্য থাকার কথা। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।নেতারা ইফতারের টেবিলে রাজনীতির ছবি তোলেন, আর মফস্বলের কর্মীরা সংঘর্ষে জীবন হারায়। এই দৃশ্যই আজকের জামায়াত রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম প্রতীক।
লেখক : সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী। সদস্য – গ্লোবাল কমিউনিটি, এ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল। ফ্রান্স